জলেশ্বরী: ওবায়েদ হক

বুক রিভিউ

সেইসব গ্রামে বাঁশির সুর নেই, আহাজারি আছে। বুনো ফুলের সুবাস নেই, লাশের গন্ধ আছে। সেখানে জীবন আছে, আছে সংগ্রাম। সেখানেই কোথাও আছে জলেশ্বরী, যাকে খুঁজতে বেড়িয়েছে কাজল।

আজকে আলোচনা করবো- ওবায়েদ হকের সাড়াজাগানো বই ‘জলেশ্বরী’ নিয়ে_

বইয়ের কিছু তথ্য:

বই: জলেশ্বরী

লেখক: ওবায়েদ হক

প্রকাশনী: বায়ান্ন (৫২)

প্রচ্ছদ: তৃত

মূল্য: ২৫২৳

লেখক পরিচিতি:

কোন বইয়ের মূল আলোচনা পড়া শুরু করার আগে লেখক সম্পর্কে একটু জানার জন্য প্রথমেই লেখক পরিচিতি পড়াটা আমার অভ্যাস। এই অভ্যাসের জন্য জলেশ্বরী পড়তে যেয়ে একটু চমকে গেছিলাম! লেখক পরিচিতিতে লেখা ছিলো-

বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা উল্টিয়ে লেখকের পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। লেখক যুবক নাকি বৃদ্ধা, শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত, ধনী নাকি দরিদ্র এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। লেখকের পরিচয় পাওয়া যাবে প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার মাঝের পৃষ্ঠাগুলোতে। কালো কালো হরফের লেখাগুলোকে লেখক সন্তান মনে করেন, সন্তানের পিতা হিসেবেই তিনি পরিচিত হতে চান।

বই সম্পর্কে কিছু কথা:

একদিকে বাবার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করার জন্য ছেলের ছোটাছুটির গল্প। আর অন্যদিকে ১৯৮৮ সনের বাংলাদেশের বন্যা কবলিত এলাকার দুঃখ-দুর্দশার কথা। বন্যায় ঘর-বাড়ি ডুবে যাওয়া, ফসলের জমি ভেসে যাওয়া, এসব নিদারুণ কষ্টের এক বাস্তব গল্পের নাম- ‘জলেশ্বরী’।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা:

লস এঞ্জেলসে নয় বছর থাকার পর হঠাৎ করে একটা জরুরী ফোন এসে জানালো বাবা নেই, ছয়তলার ছাদ থেকে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে আমার শক্তসমর্থ বাবা। আমি বাংলাদেশে এসে আর বাবাকে দেখিনি, শুধু তাঁর নতুন কবর দেখেছি। প্রথম দিকে বাবার মৃত্যুটা স্বাভাবিক ভাবলেও পরবর্তীতে একটা সাদা কাগজে দুটি লাইন আমাকে উলট পালট করে দিলো। মোটা গাঢ় কালিতে লেখা, “ইব্রাহিম গাজী, আর কত? জলেশ্বরী আর মেঘনাও তোমাকে গিলতে পারেনি! আমাকে কেন ঘুমুতে দাও না, আমি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লেই কি তুমি শান্তি পাবে?” বাবা কি তাহলে আত্মহত্যা করেছিলো? আর এই ইব্রাহিম গাজী কে? এই রহস্যের সমাধান করার জন্য দু’জন বাচাল মাঝি আর একটি নৌকা নিয়ে জলেশ্বরী’র উদ্দেশ্যে বের হয়েছে কাজল। ইব্রাহিম গাজী কে? জানি না। তাকে কোনদিন দেখিনি, শুধু জানি সে জলেশ্বরী গ্রামে থাকে।

* আরো পড়ুন:-

ঘর-বাড়ি ডুবে গেছে, ফসলের জমি ভেসে গেছে, কলা গাছের পাশে ভেসে যাচ্ছে মানুষের লাশ। সবাই ছুটছে এক খন্ড ডাঙ্গার খোঁজে। নরক শুধু জ্বলন্ত হয় না, ডুবন্তও হয়। আটাশি সনের বন্যার মেঘনার পাড়ের মানুষগুলো তা নতুন করে বুঝেছিলো। জলেশ্বরী খুজতে-খুজতে কাজল চলে এসেছে বন্যায় ডুবে যাওয়া বাস্তব গ্রামে। যেখানে কৃষক হাসিমুখে হাল নিয়ে মাঠে যায় না, ছেলের লাশ ভাসায় পানিতে। যেখানে বাচ্চারা চড়ুইভাতি খেলে না, অনাহারে ক্লান্ত হয়ে মুখ হা করে বাতাস গিলে।

যেখানে ডানপিটে মেয়ের জন্য বাজার থেকে আলতা কিনে আনে না বাবারা, ক্ষুধা মেটানোর জন্য বজরায় চড়া বাবুদের কাছে বিক্রি করতে নিয়ে যায়। সেইসব গ্রামে বাঁশির সুর নেই, আহাজারি আছে। বুনো ফুলের সুবাস নেই, লাশের গন্ধ আছে। সেখানে জীবন আছে, আছে সংগ্রাম। সেখানেই কোথাও আছে জলেশ্বরী, যাকে খুঁজতে বেড়িয়েছে কাজল। জলেশ্বরী খুজতে-খুজতে কাজল বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, তাপসী নামের একজন মেয়ের সাথে ভালোবাসার একটা সম্পর্ক হয়েছে, বন্যা কবলিত মানুষের অসহায়ত্ব স চোখে দেখেছে। তবুও তার গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা থেমে থাকেনি।

কাজল শেষ পর্যন্ত কি জলেশ্বরী খুজে পেয়েছিলো? পেরেছিল কি বাবার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করতে? এরকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে জলেশ্বরী।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

এটা আমার পঠিত ওবায়েদ হক’র রচিত দ্বিতীয় বই। লেখকের লেখার সাথে পরিচয় হয়েছিল ‘নীল পাহাড়’ বই দিয়ে। নীল পাহাড় পড়ে যেমন তৃপ্তি পেয়েছিলাম, জলেশ্বরী পড়েও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি৷ আহ্ কি সুন্দর একটা গল্প! যে গল্পের মাধ্যমে অবলোকন করেছি অসহায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট। আটাশি সনের বন্যা দেখিনি, তবে বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল দু’জন বাচাল মাঝি নিয়ে ‘আমি’ নিজেই বন্যায় ডুবে যাওয়া গ্রামগুলো ঘুরতেছি! তাদের কষ্টের কথাগুলো পড়ে নিজেই ব্যথিত হয়েছি, তাদের জন্য মায়া অনুভব করেছি। এককথায় বলা যায় অসাধারণ একটা উপন্যাসের নাম- জলেশ্বরী। যার আলোচনা বা পাঠপ্রতিক্রিয়ার বলে শেষ করা যাবে না।

চরিত্র:

একটি চরিত্র আমার মনে দাগ কেটেছে,সে চরিত্রটি হলো আসাদ উদ্দিন এর চরিত্র। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে গল্পের মাঝে, তবুও তার কথাবার্তা চালচলন সবটা আমার কাছে অমায়িক লেগেছে।

তাপসীকে সচরাচর সবার ভালো লাগলেও আমার তেমন একটা ভালো লাগেনি। তার একমাত্র কারণহলো লেখক তাকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। হুট করেই এই জায়গা থেকে সেই জায়গায় তাকে নিয়ে গেছে , অনেকটা সিনেমার ম্যাজিকের মতো ।

সাহিত্যমান:

বাংলা ভাষাতে তার বেশ দক্ষতা রয়েছে, এটা স্পষ্ট রুপক ব্যবহারের মাঝেই। সাহিত্য নিয়ে কাজ করাটা তার বহু ইচ্ছে বা সাধনাও বলা যায়, সেটা বাংলা ভাষার উপর তার দক্ষতা দেখেই বুঝা যায়। অনেক লেখক সাহিত্য জগতে আছেন অথচ বাংলা ভাষার উপরই তার জানাশোনা নেই।

বইটা ভালো লাগার কারণ:

এই পয়েন্টের আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, লেখকের সাদামাটাভাবে লেখার ধরণ। গল্পের প্লট, একটা অধ্যায়ের শেষে আরেকটা অধ্যায়ের শুরু সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ উপস্থাপন। পড়া শুরু করলে শেষ করার একটা নেশা ধরে যায়। সাধারণভাবে গল্প লেখার ধরণ টা পুরা গল্পটাকে আরো অসাধারণ করে তুলেছে।

একবসাতে শেষ করার মত একটা বই।

বইটা অন্যদের কেন পড়া উচিত:

বর্তামনে আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়েরা বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের দুঃখ, দর্দশার কথা জানেনা বললেই চলে! আমাদের এই সমাজ জানেনা ক্ষুধার্ত মেয়ের অসহায় বাবার গ্লানি, একজন কিশোরী ছেঁড়া কাপড়েও কিভাবে সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা করে, বানের টানে নিঃস্ব হয়ে সড়কে কিভাবে কাদামাটির সংসার করে, আমরা জানিনা কিভাবে ক্ষুধার্ত শিশুর মৃত্যু হয় মায়ের কোলে!

* আরো পড়ুন:-

বইটা অনেকেই একটা গল্প মনে করতে পারে! তবে আমার মনে এই গল্পটা নিয়ে নিজেরা একটু চিন্তাভাবনা করলেই মানুষের অসহায়ত্ব, সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না ইত্যাদি বিষয়ে একটু জ্ঞান অর্জন করতে পারবো। গরীবদের জন্য আমাদের একটু হলেও মায়া হবে। বইটা আমাদের অজানা বিবেকটাকে অনেক কিছু জানিয়ে যাবে।জলেশ্বরী ওবায়েদ হক, জলেশ্বরী ওবায়েদ হক, জলেশ্বরী ওবায়েদ হক, জলেশ্বরী ওবায়েদ হক

লেখকের অন্যান্য বইসমূহ:

একটি শাড়ি এবং কামরাঙা বোমা

তেইল্যা চোরা

নীল পাহাড়

নেপথ্যে নিমকহারাম

বই থেকে একটা প্রিয় উক্তি:

“বেঁচে থাকাটা যেখানে বড় প্রয়োজন সেখানে আমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ আমাদের বিলাসী আয়োজন”

বিশেষ কিছু লাইন:

ধীর গতির প্রশ্বাস নিয়ে তাপসী বলল,

আপনি জলেশ্বরী যাননি?

আমি বললাম,

না, জলেশ্বরী আমার নৌকায় এসেছে।

সে কি বুঝল কে জানে। মৃদুভাবে বলল,

আমার একটা স্বপ্ন ছিল।

কি স্বপ্ন?

আমার মৃত্যুর সময় আপনি পাশে থাকবেন।

তারপর সে আমার চোখে তাকিয়ে বলল,

আমার হাতটা ধরেন একটু, খুব ভয় লাগছে।

তাপসী শ্বাস টানছে প্রবল বেগে। তার শরীরে কোনো অনুভূতি নেই। থাকলে বুঝতে পারত আমি তার হাতটা ধরেই ছিলাম।

পরিশেষে-

ওবায়েদ হক যত গল্প/উপন্যাস লিখেছেন, সেগুলোর মধ্যে ‘জলেশ্বরী’ বেশ ওপরের দিকেই থাকবে। কিছু পাঠকের মতে এটি লেখকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। উপন্যাসটির কাহিনী অনেক বেশি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে।

তাছাড়া অধিকাংশ উপন্যাসে শুধুমাত্র নায়ক-নায়িকার জীবনকেই বর্ণনা করা হয়, এক্ষেত্রেও উপন্যাসটি ব্যতিক্রম। তাই সবমিলিয়ে ওবায়েদ হকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকা করা হলে ‘জলেশ্বরী’ উপন্যাসটি সেই তালিকায় একটি স্থানের দাবি জানাতেই পারে।

আরো পড়ুন- দরুদ পাঠের দুনিয়াবী ফজীলত সম্পর্কিত একটি চমৎকার ঘটনা

পরবর্তীতে আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

আপনাদের যদি ভালো লাগে তাহলে আর্টিকেলটি আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

এতক্ষন আমাদের সাথে থাকার জন্য- ধন্যবাদ.

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *