নি: হুমায়ূন আহমেদ

বুক রিভিউ

রূপা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দেখতে দেখতে তার চোখ ভিজে উঠল। মবিনুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ইচ্ছে করছে এই পাগলী মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে দু’একটা সান্ত্বনার কথা বলতে।

বই_পরিচিতি:

বই: নি

লেখক: হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাশনী: কাকলী প্রকাশনী

মূল্য: ১৫০৳

পৃষ্ঠা: ১০০

লেখক পরিচিতি:

জন্ম: হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর

ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহুকুমার মোহনগঞ্জে তাঁর মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তাঁর পিতা একজন

পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। মৃত্যু: ২০১১-এর সেপ্টেম্বের মাসে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারী চিকিৎসার সময় তাঁর দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯শে জুলাই ২০১২তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। (তাঁকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়)

বই সম্পর্কে কিছু কথা:

‘নি’ হলো একজাতের মানুষ। এই পৃথিবীতে দীর্ঘদিন পর পর একজন ‘নি’ জন্ম নেয়৷ সাধারণ মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজম থাকে। কিন্তু একজন ‘নি’ এর শরীরে ৪৭টি ক্রোমোজম থাকে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত গল্পাকারে হুমায়ূন আহমেদ ‘নি’ দের কে নিয়ে চমৎকার এক ফ্যান্টাসি গল্প রচনা করেছেন।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা:

এই গল্পের মূল চরিত্র:

এই গল্পের মূল চরিত্র হলেন ‘মবিনুর রহমান’। তিনি এম.এসসি. পাস করার পর সব মিলিয়ে আঠারো বার চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েও কোন চাকরি না পেয়ে সর্বশেষ তিনি নীলগঞ্জ মডেল হাইস্কুলের সায়েন্স টিচারের পদে যোগ দেন। মবিনুর রহমান এক আশ্চর্য মানুষ। তাঁর বুক পকেটে সবসময় একটা গোলাকার ঘড়ি থাকে। এ ঘড়ি সাধারণ ঘড়ি নয়-একের ভেতর তিন। ঘড়ির সঙ্গে আছে স্টপ ওয়াচ এবং একটি আর্দ্রতা মাপক কাঁটা। তিনি নীলগঞ্জে এসে স্কুল দপ্তরি কালিপদ’র এক বাসা ভাড়া নেন৷ কালিপদ’র স্ত্রী-সন্তান সাপের কামড়ে মারা যাওয়ায় কালিপদ ভয়ের কারণে এ বাড়ীতে থাকা বাদ দিয়েছে। বাড়িটি মানুষ বাসের যোগ্য না। একটা মাত্র ঘর কোন রকমে টিকে আছে। কালিপদ সাপের কথা মবিনুর রহমান কে বলেছে। তিনি উদাস গলায় বলেছেন, সাপ আছে থাক না। অসুবিধা কি? সাপদের ও তো বাঁচার অধিকার আছে। মবিনুর রহমানের অধিকাংশ সময় কাটে ঘাটে বাঁধা নৌকায়।

মবিনুর রহমান ঘুমের মধ্যে অতি বিচিত্র রকমের স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে কয়েকজন বুড়ো মানুষ তাঁর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সবার চেহারা একরকম। হাসি একরকম। একসময় তারা কথা বলতে শুরু করে। মবিনুর রহমান জিজ্ঞেস করে- আপনারা কে? তারা উত্তর দেয়- আমরা হচ্ছি ‘নি’।

এই গল্পের আরেকজন মূল চরিত্র:

এই গল্পের আরেকজন মূল চরিত্রের নাম- রূপা। রূপা মেয়েটি অসম্ভব সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী। রূপা এ বছর এস.এস.সি পরিক্ষা দেবে। মবিনুর রহমান রূপাকে গত ছ’মাস ধরে পড়াচ্ছেন। এই মেয়েটা মবিনুর রহমান কে পছন্দ করে এবং ভালোবাসে। কিন্তু এ কথা সে বাসার কাউকে বলে না, এমনকি মবিনুর রহমান কে ও বলেনি! মনে-মনে মবিনুর স্যার কে ভালোবাসলেও রূপার বিয়ের জন্য বাসা থেকে রূপার জন্য তানভীর নামের এক ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসে। এবং একপর্যায়ে বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলে। অথচ রূপার চিন্তা-ভাবনা জুড়ে শুধু মবিনুর রহমানের বসবাস।

অন্য দিকে নীলগঞ্জ স্কুলের নামে বরাদ্দ ১০০ বস্তা গম থেকে ১০বস্তা গম স্কুল পায়, আর বাকি নব্বই বস্তা গম ‘চুরির’ মিথ্যা মামলায় মবিনুর রহমান ফেঁসে যায়। রুপার ভালোবাসার কথা এবং মিথ্যা চুরির কথা রূপার বাবা প্রাক্তন চেয়ারম্যান আফজাল সাহেব জানতে পেরে মবিনুর রহমান কে শাস্তি এবং অন্য দিকে রূপার মন থেকে মবিনুর রহমান কে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য মবিনুর রহমান কে জেলে পাঠিয়ে দেন।

জেলে থাকাকালীন সময়ে মবিনুর রহমান জানতে পারেন তিনি আসলে কোন সাধারণ মানুষ না! তিনি একজন ‘নি’। ‘নি’ রা একধরণের স্রষ্ঠা! ‘নি’ দের জন্ম হয়েছে স্বপ্ন দেখার জন্য। তারা স্বপ্ন দেখে- নতুন সৃষ্টি হয়। ‘নি’-দের যাবতীয় সমস্যা থেকে দূরে রাখার সব ব্যবস্থা প্রকৃতি করে রাখে। ‘নি’ রা প্রকৃতির সন্তান।

এত ক্ষমতাবান হওয়া সত্ত্বেও মবিনুর রহমান কি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন? তিনি কি রূপার বিয়ে আটকাটে পেরেছিলেন? তিনি কি রূপার মনের কথা জানতে পেরেছিলেন? রূপার কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন? মবিনুর এবং রূপার গল্পের শেষটা কেমন ছিলো? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর এবং কিছু অজানা বিষয় জানতে হলে পড়ে ফেলুন- ‘নি’।

গল্পের আরো কয়েকজন মূল চরিত্র:

আরবী শিক্ষক- জালালুদ্দিন সাহেব। স্কুলের হেড মাষ্টার- হাফিজুল কবির। রূপার বড় ভাই- রফিক।রূপার (ভাতিজি) ভাইয়ের মেয়ে- জেবা।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

১০০ পৃষ্ঠার ছোট একটা বই ‘নি’। পড়ার শুরু করার আগে নিজে-নিজে ভাবছিলাম ‘নি’ এটা আবার কেমন নাম! মনে হয় এ বইটা খুব একটা ভালো লাগবে না! অথচ পড়ার পরে আমার এ মনোভাব দূর হয়ে গেছে। পড়া শেষে মনে হয়েছে কি চমৎকার, আহ্! কি অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম। আমি একবসায় বইটা শেষ করেছি। হুমায়ূন আহমেদ’র বই বরাবর’ই আমার অনেক ভালো লাগে। পড়তে পড়তে কেমন যেন মুগ্ধ হয়ে যায়! এ বইটাও পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আশা করি বইটা আপনাদের কাছও অনেক ভালো লাগবে।

বইটা ভালো লাগার কারণ:

বইটা ভালো লাগার বিশেষ কোন কারণ নেই। তবে ‘নি’ গল্পের মূল চরিত্র- মবিনুর রহমানের সহজ সরলভাবে জীবন-যাপন, তার চলাফেরা, কথাবার্তা সবকিছু কেমন যেন আমাকে মুগ্ধ করেছে।

* আরো একটা বইয়ের রিভিউ পড়ুন-

অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েও সততার উপর অবিচল থেকে কিভাবে সাদামাটাভাবে জীবন যাপন করা যায় সেটা মবিনুর রহমানের গল্প পড়ে বুঝেছি। আর হ্যাঁ- হুমায়ূন আহমেদ’র বই সবসময়ই আমার অনেক ভালো লাগে। সুতরাং আমার ভালোলাগা বলতে আপতত এতটুকুই।

বইটা অন্যদের কেন পড়া উচিত:

সমাজের উচ্চ শিক্ষিত হয়েও গল্পের নায়ক মবিনুর রহমানের মতো যারা বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে না, তারা হাল ছেড়ে না দিয়ে সফলতার জন্য অপেক্ষা করার সুন্দর একটা মানসিকতা তাদের তৈরি হবে। এবং এ মানসিকতা অবশ্যই একসময় আপনি সফল করবে। অন্যদিকে যারা সমাজের উচ্চ পদের কর্মকর্তা, সমাজের বিত্তশালী লোকজনের কু-চক্রের শিকার হয়ে বিভিন্ন ফাঁদে আটকা পড়ে, সে সময়েও নিজের উপর, নিজের সততার উপর কিভাবে বিশ্বাস রাখতে হবে ‘নি’ বইটা পড়লে সেটাও বুঝতে পারবে। আপনার সততা’ই আপনাকে সব বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দিবে।

সুতরাং- নিজেকে নতুনভাবে জানার জন্য, সাথে-সাথে সামাজিক এবং চমৎকার এক রোমাঞ্চকর গল্প পড়তে হলে অবশ্যই ‘নি’ বইটা পড়ে ফেলুন।নি- হুমায়ূন আহমেদ, নি- হুমায়ূন আহমেদ, নি- হুমায়ূন আহমেদ

বিশেষ কিছু লাইন:

মবিনুর রহমান ডাকলেন- রূপা, রূপা!

রূপা নৌকার ভেতর থেকে বের হয়ে এল।

রূপা বলল, স্যার আমার ভীষণ ভয় লাগছে।

নদী এগুচ্ছে। নদীর জল ফুলেফেঁপে উঠছে। মবিনুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন। রূপা আবার বলল, স্যার আমার ভয় লাগছে। খুব ভয় পাচ্ছি স্যার…..

* এই টপিকের উপর আরো আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন-

পরবর্তীতে আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

আমাদের আজকের আর্টিকেলটি কেমন লেগেছে সেটা কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের কে জানাতে পারেন। আপনাদের ভালো লাগায় আমরা উতসাহিত হই।

বই পড়ুন, বইয়ের আলোয় নিজেকে আলোকিত করুন। বেশি বেশি বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে। সুতরাং, নিজে বই পড়ার পাশাপাশি অন্যদের কে উৎসাহিত করুন।

ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। নিরাপদ থাকুন।

আপনাদের যদি ভালো লাগে তাহলে আর্টিকেলটি আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

এতক্ষন আমাদের সাথে থাকার জন্য- ধন্যবাদ.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *