পদ্মানদীর মাঝি: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

বুক রিভিউ

‘আমারে নিবা না মাঝি?’

বই_পরিচিতি:

বইয়ের নাম: পদ্মানদীর মাঝি

লেখক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশনায়: কামরুল এন্টারপ্রাইজ,

বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০

মূল্য: ছাব্বিশ টাকা (প্রথম মুদ্রণ ১৯৯৮)

লেখক পরিচিতি:

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিহারের সাঁওতাল পরগণা জেলায় দুমকা শহরে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র হিসেবে তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে বি. এস. সি অধ্যায়নকালে ‘অতসী মামী’ নামে একটি গল্প রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করেন। পড়াশোনা তিনি শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে সাহিত্য-সৃষ্টিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁর এ গৌরবজনক পদচারণা তাঁর মৃত্যুর (১৯৫৬) পৃর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

বই সম্পর্কে কিছু কথা:

‘পদ্মানদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যের একটি আঞ্চলিক উপন্যাস। এই উপন্যাসে পদ্মার মাঝি ও জেলেদের জীবনের সুখ-দু:খের বাস্তব রূপ তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের মাঝি ও জেলেদের জীবনের হাসি-কান্না, অভাব-অনটন, অভিমান-অভিযোগ এসব নিয়ে বাস্তবের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়া এক জীবন্ত উপন্যাসের নাম- পদ্মা নদীর মাঝি।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা:

পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটা কয়েকটি ভিন্ন-ভিন্ন চরিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান চরিত্র/নায়ক হলো- ‘কুবের’। কুবের পদ্মানদীর এক পাকা মাঝি। সে নদীতে তার সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে মাছ ধরে। একদিকে যেমন সে মাঝি, অন্য দিকে সংসারের অভিভাবক, পঙ্গু মালার স্বামী, সন্তানদের স্নেহময় পিতা। কুবের সৎ মানুষ থাকার চেষ্টা করে,

কিন্তু জীবনযুদ্ধের কাছে হেরে যায়।

কেতুপুর এলাকার একজন অভিজ্ঞ এবং প্রচুর অর্থের মালিক ছিলেন হোসেন মিয়া। এই হোসেন মিয়া তার মতলব হাসিল করার জন্য জেলেদের বন্ধু হয়েছিল। সে তাদের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের সাথী ছিল। নোয়াখালীর সন্দীপ থেকে পূর্ব-দক্ষিণে সমুদ্রের বুকে হোসেন মিয়া একটি দ্বীপের পত্তনি নিয়েছিল। দ্বীপের নাম দিয়েছিল ‘ময়না দ্বীপ’। এলাকার দরিদ্র মানুষদের নানা রকম উপকার করে তাদেরকে ময়না দ্বীপে নিয়ে যেত। বৃষ্টির একরাতে হোসেন মিয়া কুবের ঘরে আশ্রয় নেয়। কুবের তার সংসারের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট এসব দেখতে দেখতে সে তার বাড়ীতে আশ্রিত ঘুমন্ত হোসেন মিয়ার পকেট থেকে দু’এক পয়শা চুরি করে। কিন্তু এই পাপবোধ কুবেরকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। একসময় টাকা চুরি ও ঘটি’র চক্করে ফেঁসে গিয়ে জেল খাটার ভয়ে হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপে যাত্রা করে কুবের। যাত্রাকালে ‘কপিলা’ ও

* আরো একটা বইয়ের রিভিউ পড়ুন-

তাঁর সাথে যেতে চাই।

পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের নায়িকা হলো ‘কপিলা’। কপিলা হলো কুবের পঙ্গু স্ত্রী’র বোন অর্থাৎ- কুবেরের শ্যালিকা। সাংসারিক পরিচয়ে কপিলা বিবাহিতা। তার স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় সে বাপের বাড়ীতে চলে আসে। এবং বন্যার সময় সে তার বোনের

বাড়ী কেতুপুর আসে।

নিম্নবিত্ত পর্যায়ের মানুষ হলেও কুবেরের মনে কামনা-বাসনা আছে। সে আস্তে আস্তে তাঁর স্ত্রী মালার বোনের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। কিন্তু চপলমতি কপিলা কুবের কে ব্যতিব্যস্ত করে। ফলে, কুবের অসহায়বোধ করে। এক সময়ে কপিলার স্বামী কপিলাকে নিয়ে যায়। এভাবে চলতে চলতে এই কপিলাই আবার কুবেরের কাছে আসে, এবং প্রেমের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকে। কুবের বিশ্বাস করতে চাই না যে, কপিলা তাকে ভালবাসে। এসব তার ছলচাতুরী, এসব কপিলার অভিনয়। কিন্তু কুবের যখন চুরির দায় এড়াতে হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপে যেতে মনস্থ করে, তখন কপিলা ও তাঁর সাথী হতে চাই। চিরকালের জন্য কুবেরের হাত ধরে চলে যেতে চায় ময়না দ্বীপে।

কপিলা বলে- ‘আমারে নিবা না মাঝি?’

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘পদ্মানদীর মাঝি’ চমৎকার একটি আঞ্চলিক উপন্যাস। উপন্যাসের গল্প, নিজস্ব বর্ণনার ভাষা, সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ একটা বই। আমি একবসাতে শেষ করেছি, তারপর ও মন ভরেনি! বাধ্য হয়ে আরো কয়েকবার পড়লাম।

এই উপন্যাস টা কেউ না পড়ে থাকলে বলতে হয়- অনেক বড় কিছু অথবা অনেক চমৎকার কিছু মিস করে ফেলেছেন। একটি সুখপাঠ্য, সার্থক ও বিশিষ্ট আঞ্চলিক উপন্যাস পড়তে চাইলে আজ’ই শুরু করুন- ‘পদ্মানদীর মাঝি’

চরিত্র_বিশ্লেষণ:

কুবের

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুবের। কুবের এ উপন্যাসের নায়কও৷ কুবের একদিকে যেমন তার সংসারের অভিভাবক, তেমনি সে চির পঙ্গু মালার স্বামী, অন্যদিকে সে তার সন্তানের স্নেহময় পিতা। সংসারে তার অনেক অভাব, অনেক কষ্ট, তাই সে সৎ থাকার চেষ্টা করেও অনেক সময় সৎ থাকতে পারে না৷

কপিলা

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের নায়িকা কপিলা। ব্যক্তিগত পরিচয়ে সে মালার বোন, সাংসারিক পরিচয়ে সে একজনের স্ত্রী। মালার মত সে পঙ্গু নয়। স্বামীর সাথে ঝগড়া করে বাপের বাড়ীতে চপল এলেও সেই স্বামী ও সেই সংসারে প্রতি তার দূর্বলতা রয়েছে।

হোসেন মিয়া

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের রহস্যময় অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রধান চরিত্র হোসেন মিয়া। নোয়াখালীর এই লোকটি বহুদর্শী ও বহু অভিজ্ঞ এক ব্যক্তি৷ কেতু পুর এলাকায় প্রথমে তাকে দীনহীন ও কপর্দকশূন্য এক ব্যক্তিরুপে প্রথমেই তার দেখা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তনটা যেন ভেল্কিবাজির মত মনে হয়।

* আরো একটা বইয়ের রিভিউ পড়ুন-

এই উপন্যাসের হোসেন মিয়ার চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যেন তাঁর সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সাকার করে তুলেছেন। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায় যে, হোসেন মিয়া শুধু এই উপন্যাসের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের একটি অভিনব চরিত্র।

অন্যান্য চরিত্র:

কুবের, কপিলা ও হোসেন মিয়া ছাড়াও আরো কয়েকটি চরিত্র এই উপন্যাসে রয়েছে। যেমন- রাসু, ধনঞ্জয়, পীতম মাঝি, মালা, গনেশ, আমিনুদ্দিন, রসুল, ফাতেমা প্রভৃতি চরিত্র। এসব চরিত্রাবলীর সমন্বয়ে এ উপন্যাসটিতে একটি সার্থক সমাজচিত্র অঙ্কনের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

বইটা অন্যদের কেন পড়া উচিত:

‘পদ্মানদীর মাঝি’ নিয়ে একবাক্যে বলা যায় যে, এটি একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাস। উপন্যাসে নিম্নশ্রেণী গ্রাম্য জীবনের অপরিমেয় সত্য কথা তুলে ধরেছেন। এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্টতার দাবিদার রাখে। পদ্মা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। এ নদী এলাকার কয়েকটি গ্রামের জেলেদের জীবনের নিখুঁত জীবনচিত্র গলে উল্লেখ হয়েছে।

সুতরাং- গ্রামীণ জীবনের সুখ দুঃখের বাস্তব চিত্র জানতে হলে, তাদের ব্যথায় ব্যথিত হতে হলে, বইটা পড়া আবশ্যক।

আঞ্চলিক উপন্যাস হিসেবে উপন্যাসটির সার্থকতা:

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি আঞ্চলিক উপন্যাসের নাম বললে প্রথমেই মুখে আসবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের নাম। বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত ও জননন্দিত এ উপন্যাসটি কতিপয় বৈশিষ্ট্যের জন্য শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উপন্যাসের মর্যাদা পেয়েছে।

যেমন-

১) এ উপন্যাসের পটভূমি। পদ্মানদী তীরবর্তী কেতুপুর সংলগ্ন যে এলাকাটির মানুষের জীবনচিত্র এখানে অঙ্কিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে বাইরের সম্পর্ক বিবর্জিত।

২) এ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রিরা একান্তভাবেই এই এলাকা ও পরিবেশের উপযুক্ত।

৩) এ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রিদের মুখে প্রযুক্ত কৃত্রিমতা বিবর্জিত আঞ্চলিক ভাষা।

৪) উপন্যাসের বর্ণনার ভাষা সাধু, কিন্তু পাত্র-পাত্রিদের মুখে প্রযুক্ত আঞ্চলিক ভাষার পরিমিত ও শৈল্পিক প্রয়োগ উপন্যাসটিকে উপভোগ্য ও সার্থক করে তুলেছে।

বিশেষ কিছু লাইন:

কপিলা চুপিচুপি বলে, না গেলা মাঝি, জেল খাট। কুবের বলে, ‘হোসেন মিয়া দ্বীপে আমারে নিবই,

কপিলা। একবার জেল খাইটা পার পামু।

ফিরা আবার জেল খাটাইব।

এই টপিকের উপর আরো আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন-

পরবর্তীতে আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

আমাদের আজকের আর্টিকেলটি কেমন লেগেছে সেটা কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের কে জানাতে পারেন। আপনাদের ভালো লাগায় আমরা উতসাহিত হই।

বই পড়ুন, বইয়ের আলোয় নিজেকে আলোকিত করুন। বেশি বেশি বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে। সুতরাং, নিজে বই পড়ার পাশাপাশি অন্যদের কে উৎসাহিত করুন।

ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। নিরাপদ থাকুন।

আপনাদের যদি ভালো লাগে তাহলে আর্টিকেলটি আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

এতক্ষন আমাদের সাথে থাকার জন্য- ধন্যবাদ.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *