রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়

ইসলামিক কর্ণার

যারা রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তাদের জন্য সুন্দর সমাধান

আপনার প্রচুর রাগ? রাগ হলে মাথা ঠিক থাকেনা? কাকে কি বলছেন ঠিক করতে পারছেন না? খুব সমস্যা তো তাহলে! আজকাল প্রায়ই দেখা যাচ্ছে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার পোস্ট দিচ্ছে মানুষ। কিভাবে রাগ কমাবো, কিভাবে রাগ উঠলে ঠান্ডা হবো ইত্যাদি ইত্যাদি। তার উত্তর দিতে আজ এই লেখা। ১০০% গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে না যে নিচের কাজ গুলা করলে আপনার রাগ কমবেই কমবে, বলা যেতে পারে যে কমার সম্ভাবনা আছে। চেষ্টা করে দেখুন, যেকোনোটা কাজে লেগে যেতে পারে।

তার আগে কিছু কথা বলা যাক। বেশি রাগ হওয়া, কম রাগ হওয়া কে ঠিক রোগ বলা যায়না। মানুষের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য বলা যায়। অবশ্যই একটা সীমার উপরে গেলে সেটা রোগ হিসেবে হয়তো গণ্য হতে পারে। কিন্তু অন্যদের তুলনায় নিজের রাগ বেশি হলেই নিজেকে মানসিক রোগী ভাবতে শুরু করে দিবেন না, নিজ থেকে চেষ্টা করুন রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে। রাগের প্রয়োজন আছে ঠিকই কিন্তু রাগের বশে কাছের মানুষ দূরে চলে গেলে কিন্তু নরকযন্ত্রণা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। যায় হোক, উপায় গুলাতে আসা যাক। দেখুন কোনোটা কাজে লেগে যায় নাকি-

.

(১) রাগ ওঠলে আন্তরিকভাবে ‘‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাজিম’’ পড়া:

.

মু‘আয ইবনু জাবাল (রা.) বলেন, দুই ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গালাগালিতে (ঝগড়ায়) লিপ্ত হলো। (প্রচণ্ড রাগে) তাদের একজনের চোখ লাল হয়ে গেলো এবং তার শিরা-উপশিরা ফুলে ওঠলো। তখন নবিজি বলেন, ‘‘আমি এমন একটি কালিমা (বাক্য) জানি, যা পাঠ করলে তার রাগ চলে যাবে। তা হলো, ‘‘আ‘উযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাজিম।’ ’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৫৪০]

.

কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন, ‘‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো উসকানি তোমাকে পেয়ে বসে, তবে তুমি ‘আ‘উযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রজিম’ পড়ে নাও।’’ [সুরা হা-মিম সাজদাহ, আয়াত: ৩৬]

.

(২) রাগ/ক্রোধ সংবরণের লাভ সম্পর্কে জানা:

.

আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে চলো, যার পরিধি হলো আসমান ও জমিন (সমান), যা তৈরি করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল (উভয়) অবস্থায় (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর সৎকর্মশীলদের আল্লাহ ভালবাসেন।’’ [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩-১৩৪]

.

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে তার জিহ্বাকে হেফাজত করবে, আল্লাহ আল্লাহ তার গোপনীয়তা ঢেকে রাখবেন। যে তার রাগ-ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।’’ [ইমাম বাইহাকি, শু‘আবুল ঈমান: ৭৮১৮; শায়খ আলবানি, সিলসিলা সহিহাহ: ২৩৬০; হাদিসটির সনদ হাসান]

.

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা কার্যকরের সক্ষমতা সত্ত্বেও নিজের রাগকে হজম করে ফেলবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হৃদয়কে সন্তুষ্টি দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন।’’ [ইমাম তাবারানি, মু‘জামুল আওসাত্ব: ৬০২৬; শায়খ আলবানি, সহিহুত তারগিব: ২৬২৩; হাদিসটি হাসান]

.

(৩) অবস্থান পরিবর্তন করা:

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হবে, তখন দাঁড়িয়ে থাকলে সে যেন বসে যায়। এতেও যদি তার রাগ দূর না হয়, তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে।’’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৭৮২; হাদিসটি সহিহ]

.

(৪) চুপ হয়ে যাওয়া:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যখন তুমি রাগান্বিত হবে, তখন চুপ থাকবে।’’ [ইমাম বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ: ১৩৩৪; শায়খ আলবানি, সিলসিলা সহিহাহ: ১৩৭৫; হাদিসটি সহিহ]

* আরো পড়ুন-

(৫) অজু করে নেওয়া:

আবু ওয়াইল আল-কাস (রাহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা উরওয়াহ ইবনু মুহাম্মাদ আস সা’দির নিকট গেলাম। তখন এক ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে তাকে রাগিয়ে দিলো। এরপর তিনি দাঁড়ালেন এবং অজু করলেন। অতঃপর বললেন, আমার পিতা আমার দাদা আতিয়্যাহ (রাহ.) থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘রাগ হচ্ছে শয়তানি প্রভাবের ফল। শয়তানকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আগুন পানি দিয়ে নেভানো যায়। অতএব, তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে, সে যেন অজু করে নেয়।’’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৭৮৪; হাদিসটির সনদ দুর্বল]

.

(৬) রাগের খারাপ পরিণতির কথা চিন্তা করা।

বিশেষত, রাগের সময়ে নেওয়া অধিকাংশ সিদ্ধান্তই ভুল হয়, সেটি ভাবা। এজন্যই বলা হয়, ‘‘রেগে গেলেন, তো হেরে গেলেন!’’

.

(৭) রাগের মুহূর্তে ওই জায়গা থেকে চলে যাওয়া.

একটি উত্তম সমাধান। কারণ ভিন্ন পরিবেশে মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে।

.

(৮) নিজেকে নিজে শাস্তি দেওয়া:

এটা এভাবে হতে পারে যে, নিজের জন্য নিয়ম বানিয়ে নেওয়া: একবার রাগারাগি করলে ৫০/১০০ টাকা (যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে) সাদাকাহ করা হবে অথবা ১০/২০ রাকাত নফল নামাজ পড়া হবে ইত্যাদি। তাহলে, পরেরবার রাগ করার আগে চিন্তা আসতে পারে।

.

(৯) ইস্তিগফার করা:

হুযাইফা (রা.) নিজ পরিবারের লোকদের উপর প্রায়ই রাগারাগি করতেন। তিনি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সমাধান চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তুমি ইস্তিগফার থেকে কোথায় রয়েছো? প্রতিদিন তুমি ৭০ বার ইস্তিগফার পড়বে।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৩৮১৭; হাদিসটির সনদ দুর্বল]

.

(১০) যিকর করা:

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয়সমূহ প্রশান্ত হয়।’’ [সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮]

.

ইসলামিক ঘরানা বাদে, রাগ নিয়ন্ত্রণের আরো কিছু উপায়-

.

গুণতে থাকুন।

হ্যা, এটা একটা কার্যকরী উপায়। খুব বেশি রাগ উঠে গেলে চোখ বন্ধ করে ১০০ থেকে উল্টা গুণতে থাকুন। তাড়াতাড়ি গুণতে না পারলে সময় নিয়ে গুনবেন। ১০-২০ এ আসতে আসতে রাগ সামান্য ঝরে যেতে পারে। কাজ করবেই বলছি না, তবে চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?

.

হাটতে যাওয়ার বা সাইকেলিং করা

কোনোভাবে কি বাইরে হাটতে যাওয়ার বা সাইকেলিং করার সুযোগ আছে? বেশি রেগে গেলে রাগের কারণের আশেপাশে না থেকে হাটতে বের হউন, দরকার হলে দৌড়ান। শরীর এসব কাজের জন্য শক্তি যোগাতে গিয়ে আর রাগের দিকে মন দিতে পারবে না।

.

মোটিভেট করুন

এবার একটু সেল্ফ মোটিভেট করার সময় হয়েছে। নিজেকেই নিজে মোটিভেট করুন। বলুন সব ঠিক হয়ে যাবে, সামনে যে দাড়িয়ে আছে তার উপর রাগ করলে হিতে বিপরীত হবে। আপনি তা চান না, শান্ত হউন। পারলে জোরে জোরে বলুন কিংবা মনে মনে, নিজেকেই নিজে বোঝান, দেখুন কাজ হয় নাকি।

* আরো পড়ুন-

চুপ হয়ে যান।

রেগে গেলে চুপ হয়ে যান। কিচ্ছু বলবেন না। কিছু বোঝাতে হলেও না। মাথা ঠান্ডা হলে পরে গিয়ে বোঝাবেন কিন্তু রাগের মাথায় বোঝাতে যাবেন না। ভাবছেন আপনি বোঝাচ্ছেন কিছু কিন্তু আসলে সামনের মানুষটিকে কখন অপমান করে বসবেন তখন আর তা ফেরত নেওয়ার উপায় থাকবে না। তার থেকে বরং চুপ করুন, অন্য রুমে চলে যান, চুপ করে থেকে চোখ বন্ধ করে জোরেজোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন। রাগের কারণ যা ই হোক না কেনো, সেখান থেকে সরে আসুন।

.

ডায়েরী লেখা

নিত্যদিনের কথা লিখেন এমন কোনো ডায়েরী বা ব্যক্তিগত ডায়েরী? সেখানেই রাগের কারণ লিখে রাখুন। আপনি কেনো রাগলেন, কি হলে রাগতেন না, আপনার দোষ নাকি তার দোষ, এসব যাবতীয় লেখা লিখে রাখুন। যদি কড়া কথা বলতে মন চায় সেটাও লিখে রাখুন, পরে ছিড়ে ফেলতে পারবেন কিন্তু বললে আর ফেরত নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ডায়েরী তে লিখে রাগ কমানোই বোধ হয় ভালো।

.

বন্ধুর সাথে কথা বলুন

বন্ধুবান্ধব আছে? যার উপর রাগ তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলা বন্ধ করে অন্য বন্ধুর সাথে কথা বলুন, পারলে শেয়ার করুন।

কিভাবে কি হয়েছে সব ঢেলে দিন। বলতেই থাকুন। বলা শেষ হয়ে গেলে দেখবেন রাগ আর নেই।

মাথা গরম থাকতে পারে শুধু। (বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছি)

.

কথা বলা যদি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে তবে রাগ করেছেন সেটা দেখিয়ে দিন। কিন্তু ভুলেও এমন কিছু বলবেন না যা

ভবিষ্যত নষ্ট করতে পারে। এই উপায় খুব ঝুঁকিপূর্ণ বটে। তাই একটু বুঝেশুনে রাগ দেখাবেন।

.

মজা করে কথা বলুন

রাগ হলেও কৌতুক করুন। সামনের মানুষ যেনো আপনার উপর রাগ ঝাড়তে না পারে। বিরক্ত হয়ে যেনো প্রস্থান করে।

সে রাগ ঝাড়তে না পারলে আপনার রাগও আর বাড়তে পারবে না, ফলে তা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

.

কান্না করে ফেলেন

অনেকে রাগের বশে কান্না করে ফেলেন, এটাও চমৎকার উপায়। কান্না এলে তা চেপে রাখার প্রয়োজন নেই।

রাগ বেশি হয়েছে বলেই মস্তিষ্ক তা চোখের জলে বাইরে বের করতে চাচ্ছে। কান্না থামিয়ে বেশি রেগে

যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। কান্না সেরে ফেলুন, রাগও চোখের জলের সাথে বয়ে যাবে।

.

পাঞ্চিং ব্যাগ আছে

ব্যায়াম করার সরঞ্জাম? দৌড়ে সেখানে চলে যান। পাঞ্চিং ব্যাগ টার উপর রাগ ঝেড়ে দিন। কিংবা কয়টা পুশআপ মারুন।

শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে রাগও বেশিক্ষণ থাকবে না। ফলে শরীরেরও লাভ আর সাথে আপনারও।

.

আরো হয়তো অনেক উপায় আছে। অনেকে অনেক উপায় ব্যবহার করে। আপনার কাছে ইউনিক কিছু থাকলে

জানিয়ে যেতে পারেন, অন্যের উপকার হবে আরকি। আসলে রাগ শুধুই একটা হিউম্যান ইমোশন, এটা তো থাকবেই।

কিন্তু বেশি হয়ে গেলে এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। হার্ট এট্যাকও হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুশীলন আজ থেকেই শুরু করা উচিত। আশা করি পোস্ট পড়ে কেও না কেও উপকৃত হয়েছেন বা হবেন।রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়, রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়, রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়, রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়

এই টপিকের উপর আরো আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন-

আল্লাহ আমাদের সবার দোয়া কবুল করুক। এবং পাশাপাশি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে মাফ করুক; আমিন

পরবর্তীতে আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

আমাদের আজকের আর্টিকেলটি কেমন লেগেছে সেটা কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের কে জানাতে পারেন। আপনাদের ভালো লাগায় আমরা উতসাহিত হই।

ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। নিরাপদ থাকুন।

আপনাদের যদি ভালো লাগে তাহলে আর্টিকেলটি আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

এতক্ষন আমাদের সাথে থাকার জন্য- ধন্যবাদ.

আল্লাহ হাফেজ ..

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *