সন্তান লাভের জন্য ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আমল: স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এই আমলগুলো করবেন।

ইসলামিক কর্ণার

সন্তান লাভের জন্য ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আমল: স্বামী-স্ত্রী উভয়েই

এই আমলগুলো করবেন।

(১) নবি যাকারিয়্যা (আ.)-এর দু‘আ:

.

যাকারিয়্যা (আ.) তখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা (সন্তানহীনা)। এমন কঠিন ‘অনিশ্চয়তা’ সত্ত্বেও যাকারিয়া (আ.) পিতা হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

.

সেজন্যে তিনি দু‘আ করেছিলেন, ‘…হে আমার রব! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যের কারণে মস্তক (চুল) শ্বেত-শুভ্র হয়ে গেছে। হে রব! আপনাকে ডেকে আমি কখনো নিরাশ হইনি। আমি আমার পরে স্বগোত্রীয়দের ব্যাপারে আশঙ্কা করি। আর আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা। অতএব, আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন…।’ [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ০৪-০৫]

.

সন্তান কামনায় যাকারিয়্যা (আ.)-এর কয়েকটি দু‘আর বাক্য কুরআনে এসেছে—

.

(رَبِّ) فَهَبۡ لِیۡ مِنۡ لَّدُنۡکَ وَلِیًّا

.

(হে আমার রব) অতএব, আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ০৫]

(এই দু‘আর মধ্যে ‘‘রব্বি’’ শব্দটি এভাবে কুরআনে আসেনি। এজন্য ব্রাকেটে দিয়েছি)

.

তিনি আরও দু‘আ করেছিলেন—

.

رَبِّ لَا تَذَرْنِيْ فَرْدًا وَّأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِيْن

.

‘‘হে আমার রব! আমাকে একা রাখবেন না। আপনিই তো উত্তম ওয়ারিশ।’’ [সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯]

.

যাকারিয়্যা (আ.)-এর আরও একটি দু‘আ—

.

رَبِّ هَبْ لِيْ مِنْ لَّدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً‌ۚ اِنَّكَ سَمِيْعُ الدُّعَآءِ

.

অর্থ: হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পুত-পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮]

.

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবুল করেন। যাকারিয়া (আ.)-এর স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন ইয়াহইয়া (আ.)। সুতরাং, এই দু‘আগুলো কাকুতি-মিনতি করে বেশি বেশি পড়তে পারেন। বিশেষত দু‘আ কবুলের সময়গুলোতে পড়বেন।

.

(২) বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা:

.

ইস্তিগফার মানে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নির্দিষ্ট বড় বড় গুনাহের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে সকল গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফার সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে কাজ করে। তাই, সন্তান লাভের জন্য ইস্তিগফার করুন।

.

কুরআন কারিমে এসেছে, ‘‘(নূহ আ. বলেন) অতঃপর আমি বললাম: তোমরা তোমাদের রবের নিকট ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি দেবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্যে বাগ-বাগিচা স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদী-নালা প্রবাহিত করবেন।’’ [সুরা নুহ, আয়াত: ১০–১২]

.

একবার হাসান বাসরি (রাহ.)-এর নিকট বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিতে আসেন। তখন তিনি উপরের আয়াতগুলোর আলোকে সবাইকে ইস্তিগফারের পরামর্শ দেন।

.

* আরো পড়ুন-

.

(৩) নবিজির উপর দরুদ পাঠ করা:

.

একজন সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, তিনি তাঁর দু‘আর সবটুকুই নবিজির উপর দরুদ পাঠের জন্য বরাদ্দ করবেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘যদি তুমি তাই করো, তবে তোমার সকল চিন্তা ও উৎকণ্ঠা দূর করা হবে (প্রয়োজন পূরণ হবে) এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।’’ [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ২৪৫৭; হাদিসটি সহিহ]

.

(৪) আন্তরিকভাবে দু‘আ করা:

.

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘কোনো মুসলমানের দু‘আয় যদি পাপ কাজ ও রক্ত-সম্পর্ক ছিন্ন করার দু‘আ না থাকে, তবে তার দু‘আ এই তিনটি উপায়ে কবুল হয়ে থাকে। (এক.) দুনিয়াতেই তার প্রার্থিত বস্তু দিয়ে দেওয়া হবে; (দুই.) অথবা পরকালের জন্য এর প্রতিদান রেখে দেওয়া হবে; (তিন.) কিংবা তার অনুরূপ কোনো (অনাগত) বিপদ দূর করে দেওয়া হবে।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১১১৩৩; ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৫৭৩; শায়খ আলবানি, সহিহুত তারগিব: ১৬৩৩; হাদিসটি সহিহ]

.

(৫) দান-সাদাকাহ করা:

.

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা সাদাকার মাধ্যমে তোমাদের রোগের চিকিৎসা করো।’’ [ইমাম বাইহাকি, শু‘আবুল ঈমান: ৩৫৫৭; শায়খ আলবানি, সহিহুল জামি’: ৩৩৫৮; হাদিসটি হাসান]

.

এছাড়া আরেকটি দ্বঈফ হাদিসে এসেছে, সাদাকাহ মুসিবত দূর করে। তাই, সাধ্যানুযায়ী সাদাকাহ করুন। বিপদ-মুসিবত দূর করতে সাদাকার ভূমিকা বিস্ময়কর।

.

(৬) নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা:

.

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘‘ওহে, যারা ঈমান এনেছো! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করো।’’ [সুরা আল বাকারাহ, আয়াত: ১৫৩]

.

রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করবে, এরপর পূর্ণরূপে দুই রাকাত নামাজ পড়বে, আল্লাহ্ তার চাওয়ার বিষয় দান করবেন—শীঘ্রই অথবা কিছু কাল পর।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৭৪৯৭; শাওয়াহিদের ভিত্তিতে হাদিসটির সনদ হাসান]

.

হুযাইফা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সমস্যায় পড়তেন, তখন নামাজে দাঁড়াতেন। [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩১৯; হাদিসটি হাসান]

.

(৭) বিশেষ কিছু কুরআনি দু‘আ পাঠ:

.

চক্ষুশীতলকারী জীবনসঙ্গী ও সন্তান কামনায় এই দু‘আটি খুবই সুন্দর—

.

رَبَّنَا هَبْ لَـنَا مِنْ اَزْوَاجِنَا وَذُرِّيّٰتِنَا قُرَّةَ اَعْيُنٍ وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا

.

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানান। [সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪]

.

رَبِّ اجْعَلْنِيْ مُقِيْمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِيْ, رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآء

.

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে এবং আমার সন্তানদের থেকে নামাজ কায়েমকারী বানান। হে আমাদের রব! আমাদের দু‘আ কবুল করুন। [সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪০]

.

* আরো পড়ুন-

.

এটি নবি ইবরাহিম (আ.)-এর দু‘আ।

.

নির্দিষ্টভাবে পুত্র-সন্তান লাভের জন্যও দু‘আ করা যাবে। যদিও ইসলামে পুত্রসন্তানের কোনো বিশেষত্ব নেই। বরং মেয়ে-শিশুর ব্যাপারে বিভিন্ন ফজিলতের কথা বলা হয়েছে। যাহোক, পুত্রসন্তানে আগ্রহীরা পড়তে পারেন এই দু‘আটি—

.

رَبِّ هَبْ لِيْ مِنَ الصّٰلِحِيْنَ

.

অর্থ: (হে আমার) রব! আপনি আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন। [সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০০]

এটিও ইবরাহিম (আ.)-এর দু‘আ।

.

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা:

.

❖ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ বার্ধক্য ব্যতীত এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার সাথে তার প্রতিষেধক/আরোগ্য সৃষ্টি করেননি।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৩৪৩৬; হাদিসটি সহিহ] তাই, উপরের আমলগুলোর পাশাপাশি সন্তান না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করুন। ভালো ডাক্তার দেখান।

.

❖ আল্লাহই সন্তান দেওয়ার মালিক। অতএব, বিশ্বাসটা শুধু আল্লাহর উপরই রাখতে হবে; অন্য কিছুতে নয়। সুতরাং সন্তান লাভের আশায় কোনো ভণ্ড পির এবং কবিরাজের কাছে গিয়ে নিজের ঈমান বিসর্জন দেবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, শক্তিমান।’’ [সুরা শুরা, আয়াত: ৪৯-৫০]

.

❖ অনেকের ক্ষেত্রে খারাপ জিনঘটিত ব্যাপার থাকতে পারে। অথবা কেউ জাদুর শিকার হয়ে থাকতে পারে। এগুলো অসম্ভব নয়। এমতাবস্থায় প্রথমে গুরুত্ব সহকারে সেলফ রুকইয়াহ (শরিয়তসম্মত ঝাড়-ফুঁক) করতে পারেন। বিষয়টি জটিল হলে ভালো কোনো রাকির সাহায্য নিতে পারেন। অনেকে হিজামা (কাপিং থেরাপি) করতে বলেন। এরও উপকারিতা আছে। এই ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে পারেন।

.

❖ হাদিসে এসেছে, মুমিনের জন্য আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই নেন, তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে এবং সেটিই তার জন্য কল্যাণকর হয়। সুতরাং, মহান রব আপনার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকুন। দুনিয়াতে আপনাকে আল্লাহ্ কোনোকিছু থেকে বঞ্চিত করলে আখিরাতে এর প্রতিদান দেবেন।

.

আল্লাহ্ তা‘আলা প্রত্যেকের বৈধ মনোবাসনা পূর্ণ করুন। নেককার সন্তান দিয়ে ঘরকে আলোকিত করুন। আমিন।

এই টপিকের উপর আরো আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন-

পরবর্তীতে আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

আমাদের আজকের আর্টিকেলটি কেমন লেগেছে সেটা কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের কে জানাতে পারেন। আপনাদের ভালো লাগায় আমরা উতসাহিত হই।

ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। নিরাপদ থাকুন।

আপনাদের যদি ভালো লাগে তাহলে আর্টিকেলটি আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

এতক্ষন আমাদের সাথে থাকার জন্য- ধন্যবাদ.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *